দেখতে নবীন, ঐতিহ্যে প্রবীণ

ডাবলিনের দ্য ভিলেজ মাঠে পাকিস্থানের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলতে নেমেছে আয়ারল্যান্ড । এবং শুরু থেকেই একচরম উত্তেজনা তৈরি হয় মাঠে। ১১ই মে বৃষ্টির জন্য টস হয়নি, ফলে ১২ তারিখ খেলা শুরু হয়  এবং প্রথম বলেই ইমাম উল হকের সাথে আয়ারল্যান্ডের ফিলডারদের রান নিতে গিয়ে ধাক্কা লাগে , ইমাম ( প্রাক্তন পাক কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান ইঞ্জামাম উল হকের ভাইপো) অনেক সময় ধরে মাঠেই  শুয়ে থাকেন। আইরিশরা যথেষ্ট ক্রিকেট-ওয়াকিবহাল, সে যতই তারা নতুন হন না কেন, কারন ইঞ্জামামের কথা মাথায় রেখেই বোধহয় তারা তার ভাইপোকে একাধিক বার রান আউট করার চেষ্টায় ছিলেন । যাই হোক মাত্র ১৩ রানে পাকিস্তানের ২ উইকেট ফেলে দিয়ে তারা ১৯৩২ সালের লর্ডসের স্মৃতি ফিরিয়ে আনেন যখন ৫৫ বছরের টেস্ট খেলিয়ে দেশ ইংল্যান্ড-কে প্রথম টেস্ট খেলতে নামা  ভারত মাত্র ১৯ রানে ৩ উইকেট ফেলে দিয়েছিল, এবং মজার ব্যাপার ঠিক জারডিন  যেমন সেদিন ব্যাট হাতে ইংল্যান্ডকে রক্ষা করেন, তেমনই ১৫৯ রানে ৬ উইকেট পরে যাওয়া পাকিস্তানকে রক্ষা করেন শা’দাব খান (৫৫) এবং ফাহিম আশরাফ (৮৩)। ফলে মারতাঘ এর ৪ উইকেট সত্বেও পাকিস্তান ৩১০/৯ তোলেজবাবে  আয়ারল্যান্ড প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৩০ রান করে যা কিনা কোনও প্রথম টেস্ট খেলতে নামা দেশের প্রথম ইনিংসে করা তৃতীয় সর্বনিম্ন রান । সবথেকে কম রান  দক্ষিণ আফ্রিকার (৮৪) এবং তারপর নিউজিল্যান্ডের (১১২)। ফলো-অন  ইনিংসে তারা এখন ব্যাট করছে। তাদের দলকে এখন বেশ নড়বড়ে লাগলেও তাদের ইতিহাস অনেক পুরনোযে ইতিহাস ঘাঁটলে  দেখা যাবে যে উনবিংশ শতক থেকেই ইংল্যান্ডের হয়ে বেশ কিছু আইরিশ খেলোয়াড় খেলেছেন এবং বর্তমানে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ব্রিটিশ দলনায়কও আইরিশ। আয়ারল্যান্ড  বিশ্বের একাদশ তম এবং ইউরোপের  দ্বিতীয় দল হিসেবে টেস্ট খেলা শুরু করল ডাবলিনের দ্য ভিলেজ মাঠে ১১ই মে ২০১৮ । ১৮ বছর পর টেস্ট খেলায় নতুন দলের আবির্ভাব ঘটল। ১৪১ বছর পর ইউরোপের কোনও দেশ  টেস্ট খেলছে।  একবার চোখ বোলানো যাক তাদের ঐতিহ্যময় ক্রিকেট ইতিহাসে

      সম্ভবতঃ ১৮শ শতকে আয়ারল্যান্ডে ক্রিকেট খেলা শুরু হয় । উনিশ শতকে আরও  কিছু ক্লাব খেলা শুরু করে এবং তাদের অনেকে এখনও ক্রিকেট খেলে। ১৮৫৫ সালে আয়ারল্যান্ডের জাতীয় দল ইংল্যান্ডের সাথে প্রথম ক্রিকেট খেলে ।  ১৮৫৮ সালে তারা এম সি সি-র বিরুদ্ধেও খেলে , ১৮৮০ সাল অবধি আয়ারল্যান্ডে ক্রিকেট ক্রমাগত জনপ্রিয় হয় । কিন্তু কিছু রাজনৈতিক ঘটনা ক্রিকেটে সমস্যা তৈরি করে। ১৯০২ সালে আয়ারল্যান্ডের সাথে লন্ডন কাউন্টির (ডবলু জি গ্রেসের নেতৃত্বাধীন )  খেলা প্রথম শ্রেণির স্বীকৃতি পায় । ১৯০৪ সালে তারা হারিয়ে দেয় সফররত দক্ষিণ আফ্রিকা কে । ১৯২৩ সালে আয়ারল্যান্ড ক্রিকেট সংস্থা তৈরি হয় ।

   ১৯৬৯ সালে আয়ারল্যান্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজ কে মাত্র ২৫ রানে অল আউট করে দেয় যেটা যদিও কোনও প্রথম শ্রেণির ম্যাচ ছিল না কিন্তু ঐ  দলে বেসিল বুচার , ক্লাইভ লয়েড এবং ক্লাইড ওয়াল্কট ছিলেন । এরপর আয়ারল্যান্ড ইংল্যান্ডের কাউন্টি-তে অংশগ্রহন করে আর আই সি সি ট্রফি খেলতে থাকে। তাদের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়াত অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রোনিয়ে খেলেছেন , খেলেছেন নিউজিল্যান্ডের জেসি রাইডার-ও । সারের মতো দলকে তারা হারিয়েও দিয়েছে ।  

       ইতিপূর্বেই বেশ কিছু আইরিশ ক্রিকেটার ইংল্যান্ড-এর হয়ে খেলেছেন সর্বচ্চো পর্যায়ের ক্রিকেট। এদের প্রথম ছিলেন লেল্যান্ড হোন। ১৮৭৯ সালে ইংল্যান্ডের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এক-খানাই টেস্ট খেলেন উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে।
  
     এরপরই নাম আসবে স্যার টিমোথি ক্যারু ও ব্রায়েন (তৃতীয় ব্যারনেট) এর। ইংল্যান্ড এর হয়ে ১৮৮৪ সাল থেকে ১৮৯৬ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৫ খানা টেস্ট খেলেন  এবং তিনি ১৮৯৬ সালে একটি টেস্ট-এ অধিনায়ক ও হন আবার আয়ারল্যান্ডের অধিনায়কত্ব-ও করেন ।  

      ফ্রেডরিখ ফেন আরেক আইরিশ ক্রিকেটার যিনি ১৪ খানা টেস্ট খেলেছিলেন ইংল্যান্ডের হয়ে।

       তালিকায় অবশ্যই বলতে হবে এড জয়েসের কথা যিনি ইংল্যান্ডের হয়ে একদিনের আন্তর্জাতিকে খেলতে নামেন তারই দেশের বিরুদ্ধে। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে তিনি ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেন তারপর আই সি সির বিশেষ অনুমতি নিয়ে তিনি ২০১১ সালের বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের হয়ে খেলেন ।  যদিও তিনি তার দেশের হয়ে বর্তমানে টেস্ট খেলছেন।

       ইয়ন মরগান আয়ারল্যান্ডের খেলোয়াড় ২০০৩ সালে ১৭ বছর বয়সে তার দেশের হয়ে খেলা শুরু করেন কিন্তু ২০০৯ সালে চলে যান ইংল্যান্ডেতিনি ২০১০-১২ এর মধ্যে টেস্ট ও খেলেন। বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডের সীমিত ওভারের ক্রিকেটে অধিনায়ক
  
       আয়ারল্যান্ডের যে অংশ এখনও ইংল্যান্ডের অংশ বা উপনিবেশ অর্থাৎ উত্তর আয়ারল্যান্ড সেখান থেকেও তিন জন খেলোয়াড় খেলেছেন ইংল্যান্ডের হয়ে । এদের মধ্যে প্রথমেই নাম আসে জোসেফ ম্যাকমাস্টার-এর ।  তিনি ১৮৯২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে একটাই টেস্ট খেলেন ।

    মারটীন ম্যাককাগু  ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে তিন খানা টেস্ট খেলেন ইংল্যান্ডের হয়ে ।

     বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের হয়ে টেস্ট খেলছেন বয়েড রানকিং। তিনি এর আগে ইংল্যান্ডের হয়ে টেস্ট খেলেন 
, যদিও একটাই ২০১৪ সালে।

   এছাড়াও আরও কিছু ক্রিকেটার ছিলেন যারা কাউন্টি খেলছেন নিয়মিত কিন্তু টেস্ট খেলেননি ।
      
         আয়ারল্যান্ড ২০০৬ সালে তাদের একদিনের আন্তর্জাতিক খেলা শুরু করে। তার আগে তারা ১৯৯৩ সালে আই সি সির সহযোগী সদস্য পদ পায় । ২০০৩ সালে তারা জিম্বাবুয়ে কে ১০ উইকেটে হারায় । ১৯৯৪ সালে তারা আই সি সি ট্রফি তে সপ্তম স্থান পায় । ১৯৯৭ সালে চতুর্থ স্থান পায় এবং অল্পের জন্য ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে আসার সুযোগ হারায় । ২০০১ সালে তারা আবার অষ্টম স্থান পায় ।   ২০০৪ সালে আই সি সি ইন্টার-কন্টিনেন্টাল কাপ শুরু করলে তারা নিয়মিত প্রথম শ্রেণী খেলার সুযোগ পায় । ২০০৫ সালে আই সি সি ট্রফিতে তারা রানার্স হয় ও ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় । ২০০৬ সালে তারা পূর্ণশক্তির ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একদিনের আন্তর্জাতিক খেলে । এই খেলায় ইংল্যান্ডের ৩০১ রান তাড়া করে তারা  ৯ উইকেটে ২৬৩ রান তোলে ।   

         ২০০৭ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ  খেলতে নেমে তারা দারুন খেলে। প্রথম খেলায় টেস্ট খেলিয়ে জিম্বাবুয়ের সাথে টাই করে, দ্বিতীয় খেলায় পাকিস্তানকে ২ উইকেটে হারিয়ে দেয় ,যদিও ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের হারিয়ে দেয় তবুও তারা সুপার-এইটে  জায়গা পায়সেখানে তারা  প্রায় সবার কাছে হারলেও টেস্ট খেলিয়ে বাংলাদেশকে হারিয়ে দেয় যারা ঐ বিশ্বকাপে ভারত কে হারিয়েছিল ।

         ২০১১ সালের বিশ্বকাপে  তারা আরও চমক দেয় । তারা ইংল্যান্ড কে হারায় তিন উইকেটে, ৩২৯ রান তাড়া করে। যদিও এর বেশি এগোতে পারেনি ।

        ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কে হারায় চার উইকেটে ৩০৫ রান তাড়া করে, এরপর আরব আমিরসাহি  কে হারায় দুই উইকেটেএরপর   তাদের ঘরোয়া ক্রিকেট কে আই সি সি প্রথম শ্রেণির স্বীকৃতি দেয় এবং ২০১৭ সালের ২২ জুন তাদের টেস্ট খেলিয়ে দেশ ও পূর্ণ সদস্য দেশের মর্যাদা দেওয়া হয় আফগানিস্তানের সাথে । 

            দেখতে নতুন হলেও আসলে প্রায় ৩০০ বছর ধরে ক্রিকেট খেলে আসা দেশটার সাফল্য কম নয়আগামী দিনে তারা ক্রিকেট দুনিয়াকে মাতাবে এই আশা করা যায়



No comments:

Post a Comment