কিছুদিন আগেই শেষ
হয়ে গেছে এই যুগের সবথেকে জনপ্রিয়তম ক্রিকেটের আসর আই পি এল।তৃতীয়বারের জন্য
দ্বিতীয় দল হিসেবে আই পি এল জিতলেন মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বাধীন চেন্নাই সুপার
কিংস।তার মধ্যে ধোনি নিজে ৮ বার ফাইনাল খেললেন এবং চতুর্থবার চ্যাম্পিয়ন দলের
সদস্য হলেন হরভজন সিং।
আই পি এলের মতো
একাধিক দেশে ফ্রাঞ্চাইসি বেসড ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হয় , কিন্তু তার কোনটাই এত
জনপ্রিয় নয় যেমন বিগ ব্যাস, বি পি এল প্রভৃতি। এখনতো পাকিস্তানে লিস্ট এ এবং
দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শ্রেনির খেলাতেও ফ্রাঞ্চাইসি আনা হয়েছে কিন্তু তার কোনওটাই
এত জনপ্রিয় নয় ।
আই পি এল এতটাই
জনপ্রিয় যে দেশের গণ্ডী ভেঙ্গে দিয়ে বর্তমানে ক্রিকেটীয় আবেগের অন্যরখম দৃষ্টান্ত
তৈরি করে চলেছে । কিন্তু কথা হচ্ছে, আই পি এল-ই কি প্রথম প্রতিযোগিতা যেখানে এক দেশের খেলোয়াড়
অন্য দেশে গিয়ে আন্তর্জাতিক নয় এমন ম্যাচে খেলছেন বা টাকা নিয়ে খেলোয়াড় বিদেশ থেকে
নিয়ে এসে খেলানো হচ্ছে? ঠিক তা নয়। অনেক আগে থেকেই সারা দুনিয়া জুড়েই এমন
দৃষ্টান্ত ছিল। তবে আই পি এল এসে তার
সবরখম পূর্বতম নজির গুলি ভেঙ্গে দিয়ে বেরিয়ে গেছে । যাই হোক আমরা একটু দেখেনি যে এর আগের সমস্ত প্রতিযোগিতা কি ছিল ।
কাউন্টি ক্রিকেটঃ
ইংল্যান্ডে সরকারি ভাবে ১৮৯০ সাল থেকে এই
প্রতিযোগিতা চলছে, যদিও বিভিন্ন গবেষকের দ্বারা ১৮৬৪ থেকে ১৮৮৯ পর্যন্ত জয়ী দলের একটা তালিকা দেওয়া হয়ে থাকে। এটি প্রথম শ্রেনির
ক্রিকেট। এখানে একদিনের লিস্ট এ ক্রিকেটও হয়ে থাকে একাধিক প্রতিযোগিতার নামে। যাই
হোক সেই উনবিংশ শতক থেকেই কাউন্টীতে বিদেশী খেলোয়াড় খেলেছে। বিলি মিডউইন্টার, বিলি
মারডোক, জে.জে. ফ্রেরিস, স্যামি উডস প্রভৃতি অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটাররা সেই উনবিংশ
শতক থেকেই কাউন্টী খেলছে। ভারত থেকে এম ই পাভ্রি মিডলসেক্স-এর হয়ে খেলেন ১৮৯৩
সালে। ১৮৯৫ সালে কাউন্টী খেলেন রঞ্জিত সিং। এম পি বাজানা, বাঙ্গালোর জয়রাম,
প্রিন্স হিতেন্দ্রনারায়ন, পরবর্তী কালে পাতোউদির ৮ম ও ৯ম নবাব, প্রিন্স দলীপ সিং
সকলেই খেলেছেন কিন্তু এরা কেউই পেশাদার ছিলেন না। ভারতের প্রথম পেশাদার ছিলেন ভিনু
মানকড় , যার জন্য তার সাথে বোর্ডের সমস্যা প্রচুর হয়েছিল ।
দীর্ঘদিন দিন ধরেই পৃথিবীর সব ক্রিকেট খেলিয়ে
দেশের খেলোয়াড়রা এখানে এসে খেলতো। পাকিস্তানের বেশীরভাগ খেলোয়াড়ের উন্নতির প্রধান
কারন ছিল কাউন্টী। জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা (বিশেষ করে ১৯৬৯-১৯৯১ পর্বে)
ইত্যাদি দেশের খেলোয়াড়দের কেরিয়ার প্রায় এখান থেকেই গড়ে উঠত। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড-এর
খেলোয়াড়রা নিয়মিত খেলতেন । এখনও এর গুরুত্ব ফুরায়নি ।
মোট ১৮ খানা কাউন্টী দল ছাড়াও আছে ২০ খানা
মাইনর দল , আরও ৭ খানা ছিল যার চারখানা এখন সিনিয়র কাউন্টী হয়েছে, আর তিন খানা উঠে
গেছে এবং ১৭ খানা সিনিয়র কাউন্টি দলের সেকেন্ড ইলেভেন এদের সাথেই খেলে। এছাড়াও ২৬
খানা প্রিমিয়ার লীগ, ২৭৬ টি স্থানিয় লীগ, ৫৭ খানা স্বাধীন স্থানিয় লীগ এবং ৩ খানা
প্রিমিয়ার গোত্রের স্বাধীন লীগ চলে। প্রায় সকলেরই ৪-৫ খানা ডিভিশন চলে। এছাড়াও আছে
ভিলেজ ক্রিকেট এবং সর্বস্তরে প্রচুর অ-ব্রিটিশজাত ক্রিকেটার খেলে। অনেকের মতে
ইংল্যান্ডের ক্রিকেটের অন্যতম সমস্যা হল এরা কারন এদের ফলে দেশিয় খেলোয়াড়রা অনেকেই
সুযোগ পায়না। ভারত, পাকিস্তান , বাংলাদেশ , শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা সহ ৩০-এর
বেশি দেশের খেলোয়াড়েরা এখানে খেলে।
ভারতঃ
ভারতে প্রায় প্রথম থেকেই
বিদেশী প্রচুর মাত্রায় খেলেছে। প্রেসিডেন্সী কাপে ইউরোপিয়ান দলের হয়ে অনেকেই
খেলছেন । জ্যাক হবস থেকে লারউড অনেকেই এসে খেলে গিয়েছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের
কিংবদন্তি স্যার লিয়ারি (লিয়ারি কন্সট্যান্টাইন) খেলেছেন ।
একেবারে আই পি এলের মতো
বিদেশ থেকে খেলোয়াড় নিয়ে এসে দেশিয়দের সাথে দল গড়ে খেলা হত মইন-উদ-দউল্লা গোল্ড
কাপ। ১৯৩০-৩১ থেকে ১৯৩৭-৩৮ অবধি রমরমা করে চলেছিল এই প্রতিযোগিতা। ১৯৬২-৬৩ সালে
আবার শুরু হয়ে চলে ১৯৭৩-৭৪ অবধি । এরপর প্রথম শ্রেণির তকমা হারায় এই প্রতিযোগিতা
যদিও তিনদিনের খেলা হিসেবে ১৯৮৯ অবধি এর অস্ত্বিত্ব ছিল । ১৯৯৩ সালে ৫০ ওভারের
খেলা হিসেবে চলেছিল। বর্তমানে ক্রিকেট
বোর্ডের নামে দল গুলি খেলে। প্রথম শ্রেণির তকমা আর ফেরান হয়নি । ১৯৩০-৩১ থেকে
১৯৩৭-৩৮ অবধি বিভিন্ন রাজবংশীয় দের দ্বারা গঠিত দল খেলত। দ্বিতীয় পর্যায়ে অফিস
দলের খেলা ছিল । শচীন তেন্দুলকারের কোচ রমাকান্ত আচরেকার তার জীবনের একমাত্র প্রথম
শ্রেণির ম্যাচ খেলেন এই প্রতিযোগিতায় স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার হয়ে।
সমস্ত বিখ্যাত দেশিয় টেস্ট খেলোয়াড় যেমন সোরাবজি
কোলা,লালা অমরনাথ , সি কে নাইডু, মহম্মদ নিশার, অমর সিং থেকে শুরু করে
অস্ট্রেলিয়ার ফ্রাঙ্ক ওয়ারন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের লিয়ারি কনি, ইংল্যান্ডের জ্যাক হবস,
হারবারট সাটফ্লিক,হ্যারল্ড লারউড, হ্যাডলি
ভেরিটি (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত) নিয়মিত খেলে গেছেন এই প্রতিযোগিতায়। এমনকি
এখানে বডিলাইন বল করা নিয়ে এল পি জয়ের সাথে লিয়ারি কনির মতবিরোধও হয়েছে।
অনেকেই শুনে অবাক হবে যে কিছু বিদেশী খেলোয়াড়
রঞ্জি ট্রফিও খেলছেন । যেমন ব্রিটিশ কিংবদন্তি ডেনিস ক্রম্পটন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের
গিলক্রিস্ট ,কিং, ওয়াটসন, স্টেয়ার, এবং অতি সাম্প্রতিক কালে খেলে গেছেন রাজস্থানের
হয়ে বিক্রম সোলাঙ্কি , কবির আলি।
কলকাতার ক্লাব ক্রিকেটে এই ধরনের ব্যাপারে সবার
আগে। ১৯২০ এর দশকে কলকাতার মাঠে যে সব ব্রিটিশরা খেলতেন যেমন লংফিল্ড, ভ্যান ডের
গুচ, ক্যাম্পবেল, প্রভৃতিরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ভবিষ্যতের ইংল্যান্ডের টেস্ট
খেলোয়াড় হিসেবে চিহ্নিত হন কিন্তু
মারচেন্টাইল কোম্পানির সুখের চাকরি ছেড়ে তারা ঐ চেষ্টা করেননি। দেশ স্বাধীন হওয়ার
পর কলকাতায় পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে খেলেছেন বিজয়
মঞ্জেরেকার, ভিনু মানকড়, সুভাষ গুপ্তে(কালীঘাট), বালু গুপ্তে থেকে আরম্ভ
করে মনোজ প্রভাকর(ইস্ট বেঙ্গল), কপিলদেব(ইস্ট বেঙ্গল) , জাভাগল শ্রীনাথ(মোহনবাগান) , অজয় শর্মা(ইস্ট বেঙ্গল),
শচীন তেন্দুলকর(এরিয়ান্স), মহেন্দ্র সিং ধোনি(শ্যামবাজার) এমনকি বিরাট কোহলিও(মোহনবাগান)। কলকাতার ক্লাব
ক্রিকেটে পি সেন ট্রফিতে আজও ব্যক্তিগত সর্বচ্চো রান ধোনির (২০৩)। তিনি শচীন
তেন্দুলকরের রেকর্ড ভাঙ্গেন ।
এপ্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল
বাংলাদেশ যখন টেস্ট খেলতনা তখন দামাল সামার ক্রিকেট কাপ (আজকের ঢাকা প্রিমিয়ার
ডিভিশন)-এ প্রচুর বিদেশী খেলতেন । ভারত থেকে বিশেষ করে বাংলা থেকে সৌরভ গাঙ্গুলি ,
অরুনলালেরা নিয়মিত সেখানে খেলতেন । এছারা শ্রীলঙ্কার সনথ জয়সূর্য, অর্জুন রনতুংগা
, অরবিন্দ ডি’সিল্ভা, ইংল্যান্ডের ফিল ডেফ্রিটাস প্রভৃতিরা খেলে গেছেন। এখনও ঢাকা
প্রিমিয়ার ডিভিশনে (যা কিনা এখন লিস্ট এ তকমা পেয়েছে) প্রচুর বিদেশী খেলোয়াড়ের
আগমন ঘটে যেমন মনোজ তিওয়ারি, উন্মুখ চাঁদ, হনুমা বিহারি, দেবব্রত দাস প্রভৃতি
ভারতীয়রা সেখানে গিয়ে খেলেন ।
যাই হোক ২০ ওভারের ক্রিকেট ম্যাচ শুরু হওয়ার পরে
জি এনটারনেইমেন্টের পক্ষ থেকে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লীগ শুরু করা হয় ভারত, পাকিস্তান,
বাংলাদেশ বিশ্ব একাদশ এবং ৯ খানা উপমহাদেশিয় শহরকে নিয়ে। এদের লক্ষ্য ছিল আর একটি
ঘরোয়া ৫০ ওভারের খেলা আয়োজন করার। কিন্তু বানিজ্যিক কারন এবং বি সি সি আই ও আই সি
সি-র সমর্থন না পেয়ে এবং ২০০৮ সালে আই পি এল শুরু হয়ে গেলে উঠে যায় আই সি এল (২০০৯
সালে শেষ বার খেলা হয়)।
মুম্বাই, চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ, দিল্লী,
আহমেদাবাদ, চণ্ডীগড়, লাহোর , ঢাকা এবং বেঙ্গল টাইগার (কলকাতা) এই ৯ টা দল নিয়ে
শুরু হয় প্রতিযোগিতা।কিন্তু বিভিন্ন কারন
বশতঃ প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়ে যায়।
এই প্রতিযোগিতায় বেশ কিছু
বিখ্যাত ক্রিকেটাররা যুক্ত হয়েছিলেন ।মুম্বাই চ্যাম্পসের হয়ে যুক্ত ছিলেন নাথান
অ্যাসলে (নিউজিল্যান্ড), হাসান রাজা ও তৌফিক উমর (পাকিস্তান), মাইকেল কাস্প্রভিচ
(অস্ট্রেলিয়া) এবং জোহান ভ্যান দের ওয়াহ (দক্ষিণ আফ্রিকা ), টিনো বেস্ট প্রভৃতি
বিদেশী এবং রবিন মরিস , কিরন পাওয়ার, শুভজিত পাল প্রভৃতিরা। চেন্নাইয়ের হয়ে খেলতেন
থিরু কুমারান, হেমাং বাদানি , জি ভিগ্নেশ এবং বিদেশিদের মধ্যে ছিলেন ইয়ান হারভে,
নেন্তি হেওয়ারড,স্টুয়ারট ল ।এছাড়াও ক্রিস কেয়ারন্স, আন্ড্রু হল, ডারেল টাফি,
আম্বাতি রায়ুডু, আব্দুল রাজ্জাক, ক্রিস হ্যারিস ও ছিলেন ।
তৎকালীন যুগের বিখ্যাত হার্ড হিটার দের নিয়ে
তৈরি এই প্রতিযোগিতা আই পি এলের পূর্বসূরি ছিল ।

No comments:
Post a Comment